ads

প্রান্তিক জনপদে হারিয়ে যাওয়া শিল্পীর নাম আহমদ কবির আজাদ

শফিউল আলম
আহমদ কবির আজাদ কক্সবাজার প্রান্তিক জনপদে হারিয়ে যাওয়া এক আঞ্চলিক শিল্পীর নাম। এই অঞ্চলে গ্রামীণ পথে প্রান্তরে যার গান এখনো বাজে। মৃত্যুর দু’যুগ পরেও বিশাল জনগোষ্ঠী, ভক্তকুল তার গাওয়া গানুগলো বিভিন্ন অডিও ক্যাসেটে তার সৃষ্টিকর্মের কিছু অংশ এখনও দরে রেখেছে। প্রায় ৭ শত গানের অডিও ক্যাসেট ভক্তকুলের মাঝে রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ গান বদরখালিস্থ সাহাবুদ্দিন মাইক সার্ভিসের মালিক সাহাবুদ্দিনের সংগ্রহে রয়েছে।
তিনি একাধারে তার মৌলিক আঞ্চলিক গান, কাউওয়ালী, হিন্দি, হ-লা (গ্রামীণ কিংবদন্তি নিয়ে রচিত গান), আধুনিক গান, নজরুল সঙ্গীত, জারী গানসহ সেই সময়ের পালাগান গেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। তার গলাকে অনেকেই আব্দুল আলিমের বিকল্প হিসেবে ধরে নিতেন।১৯৪১ সালে এ ক্ষণজন্মা সঙ্গীত সাধকের জন্ম চকরিয়া থানার চরাঞ্চল বদরখালীতে। শিল্পী হওয়ার পিছনে তার অনেক ত্যাগ, প্রচেষ্টা ও কৌশলের কথা জানা যায়। আহমদ কবির তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন পটিয়া মাদ্রাসায়। সেই সময় প্রয়াত সেলিম নিজামীর পিতা রশিদ কাওয়ালের কাছে গানের তালিম নিতেন। এখানেই সঙ্গীত সাধক গফুর হালির সাথে তার পরিচয় ঘটে। গফুর হালি জানান, “তিনি আহমদ কবির আজাদকে তার ব্যবহারের একটি হারমোনিয়াম দিয়েছিলেন”।
পরে এই হারমোনিয়াম দিয়ে তিনি গ্রামের পথে প্রান্তরে গান গেয়ে তার সঙ্গিত সাধনা শুরু করেন।মূলতঃ ১৯৬৫-৬৬ সাল থেকে তিনি গান গাওয়া শুরু করেন। কিন্তু ১৯৬৭ সালে বদরখালীতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সঙ্গীত চর্চা শুরু করলে স্থানীয় কুসংস্কার পন্থীরা তাকে বাঁধা দেয়। ফলে তিনি কিছুটা কৌশলি হয়ে এলাকার স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে যায় এরকম কিছু জারী গান, হলা (গ্রাম্য কিংবদন্তি নিয়ে রচিত গান) ও ধর্মীয় (যেমন- হাছান-হোছাইনের কারবালার ঘটনা) ইত্যাদি বিষয়ের উপর গান চর্চা শুরু করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে তিনি স্থানীয় জনগণ ও তাদের সাংস্কৃতির সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আহমদ কবির আজাদ এভাবেই একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সংস্কৃতি বিমুখ, ঘূর্ণে ধরা সমাজকে একটি সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলে প্রকারান্তে এই অঞ্চলে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হন। ঐ সময় বদরখালীসহ সমগ্র মহেশখালীতে বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে জারি, পুঁথি পরিবেশনে তিনি একনামে পরিচিত হয়ে উঠেন। পরে আহমদ কবিরকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশেষ করে মহেশখালীতে আদিনাথ মেলার বিভিন্ন মঞ্চ নাটক, বেরাটি শো ও আঞ্চলিক গানের অনুষ্ঠানে তার প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশী। যদিও স্বাধীনতার পর নিজের লেখা গান দিয়ে তিনি নিজের ইমেজ সৃষ্টি করেন এবং বৃহত্তর কক্সবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গান গেয়ে অত্র এলাকার সূর সম্রাটে পরিণত হন।১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে আহমদ কবির আজাদ এক নতুন সমস্যায় পতিত হলেন। সেই সময় গ্রামেগঞ্জে আঞ্চলিক গানের অনুষ্ঠানে পাল্টা গানের প্রচলন ছিল। (পাল্টা গান হল গানের মাধ্যমে এক শিল্পী আরেক শিল্পীকে পরাজিত করা)। এই পাল্টাগানে দ্বৈত কন্ঠ বিশেষ করে মেয়েলী কন্ঠের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে সমাজে মঞ্চে নারীদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি নারী শিল্পী কিংবা মেয়েলী কন্ঠ দিতে পারে এরকম শিল্পীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ঐ সময় একটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। ১৯৭৬ সালের দিকে চকরিয়া থানার বর্তমান পেকুয়ার মগনামাঘাটা এলাকায় পাল্টা গান গাইতে যেয়ে তিনি রবিউল নামে দুঃস্থ, পিতৃহীন এক বালকের দেখা পান এবং রবিউল তাকে আকৃষ্ট করলে পরে ঐ বালককে তিনি নিজ গ্রাম বদরখালিতে নিয়ে এসে বদরখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন এবং পাশাপাশি তাকে গানের তালিম দিয়ে শিশু শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেন। সেদিনের ঐ দুঃস্থ, অসহায় রবিউলই আজকের প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন শিল্পী রবি চৌধুরী। যাহোক ১৯৭৭ সালে উখিয়ার কোট বাজারে এক অনুষ্ঠানে বালক রবিউলকে রবিউল আজাদ বলে পরিচয় করিয়ে দেন। মূলতঃ তখন থেকেই রবি চৌধুরীর সঙ্গীত জীবন শুরু হয়। এছাড়া আহমদ কবির আজাদ বর্তমান আঞ্চলিক গানের সম্রাট খ্যাত সিরাজুল ইসলাম আজাদকে সঙ্গীতের হাতে খড়ি শিক্ষা দিয়ে তাকে ও সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালান। এছাড়া আহমদ কবির আজাদ তার শিশু পুত্র কামালকে গান গাইতে উদ্ধুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কামালকে নিয়ে বেশিদূর এগুতে পারেনি। পরে তার স্ত্রী শাহানা যিনি উখিয়ার এক অনুষ্ঠানে আজাদের গানে মুগ্ধ হয়ে তার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন। আজাদ তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলেন এবং তাকে ও শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেন। শাহানার কন্ঠে বাজারে কিছু অডিও ক্যাসেটও বের হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সমাজপতিরা হাসিনার গান চর্চা বন্ধ না করলে এলাকা ত্যাগ করতে হবে বলে হুমকি দিলে আজাদ অনেকটা বাধ্য হয়ে তার স্ত্রীকে গান গাওয়া থেকে বিরত রাখেন। জনশ্র“তি আছে তার স্ত্রী গান গাইতে না পারার ক্ষোভে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৪ সালে আজাদ ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় ধর্মান্ধ মোল্লা বাহিনী তাকে গান গাওয়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য ছাপ দেয়। তিনি স্থানীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে গান গাওয়া বন্ধ করে দেন। নিজের ধন সম্পদ না থাকায় শেষ জীবনে তিনি দাতের মাজন, কলমের কালি ও আতর ফ্যাক্টরি নিয়ে ব্যবসা করার প্রয়াস চালান। এই ব্যবসায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ফলে মৃত্যুপূর্ববর্তী সময়ে অর্থকন্ঠে পতিত হন। ২২শে ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে ৪৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অদৃষ্ঠের পরিহাস এই ক্ষণজন্মা সঙ্গীত সাধকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে তার গড়া শিল্পী ও তার কাছ থেকে সুবিধা আদায়কারী ব্যক্তিবর্গ কেউই এগিয়ে আসেননি। অথচ সেদিনের রবিউল আজাদ ও সিরাজুল ইসলাম আজাদ তাদের নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। রবি চৌধুরী “এক নয়নে কান্দ্রো” নামে একটি অডিও ক্যাসেট তার নামে উৎসর্গ করে দায়িত্ব শেষ করেছে।সম্প্রতি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে এক অনূষ্টানে রবি চৌধুরী তার গুরু
আহমদ কবির আজাদ প্রতিকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করায় রবির প্রতি সাধুবাদ জানাচ্ছি ।স্বর্তমান বদরখালির ১নং ঘোনায় আহমদ কবির ঘাটা নামে একটি গাড়ির স্টোপিজ ও ১নং ঘোনার তার ভাঙ্গা ঘর ছাড়া তার আর কোন স্মৃতি নেই। বিগত ২৯ বছরে আহমদ কবিরের স্মৃতিকে ধরে রাখতে কারো প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়নি। আহমদ কবির আজাদের লুপ্ত প্রায় স্মৃতিও গাওয়া গান নিয়ে একটি আর্কাউভ তৈরি হলে একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মান্ধ ও সংস্কৃতি বিমূখ সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি কিভাবে একটি প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা সমাজ বির্নীমাণে কান্ডারির ভূমিকা পালন করেছেন তা বর্তমান প্রজন্ম উপলব্ধি করতে পারবে। আজ তার গান হারিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি কারণে আজাদে বেশির ভাগ অডিও ক্যাসেট ও টেপ রেকড়ের মাধ্যমে বদর খালী বাজারের সাহাবুুদ্দিন মাইক সার্ভিসের স্বত্ত্বাধিকারের সংরক্ষিত রয়েছে । কালের বির্বতনে অডিও ক্যাসেট বিলুপ্তির পথে সাহাবুুদ্দিন হারিয়ে গেলে আজাদের অডিও ক্যাসেট গুলো হারিয়ে যাবে । যেহেতু আজাদ কোন যোগ্য উত্তরসূরী সৃষ্টি করে যেতে পারেনি ।
লেখক-সংগ্রহ , গ্রামীণ ফটো ব্লগ
Powered by Blogger.